১৯৯১ হতে ২০০৮ পর্যন্ত ৫ টি নির্বাচন যেভাবে হয়েছিল

১৯৯০ সালে এরশাদ সরকার এর সামরিক শাসন ধ্বসে পড়ার পর থেকে বাংলাদেশে গণতন্ত্রের উত্তরণকাল শুরু হয়। তবে, এই সময়ের পর থেকে বাংলাদেশে যত নির্বাচন হয়েছে তার ফলাফল নিয়ে পরাজিত পক্ষ সবসময়েই নাখোশ ছিল। 

১৯৯১ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত মোট ৫ টি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল দেশে। সেগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হল এই প্রতিবেদনে। 

১৯৯১ এর নির্বাচনঃ বিএনপির জয়

১৯৯১ সালে বাংলাদেশে প্রথমবার নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়। সবগুলো রাজনৈতিক দলের সম্মতিতেই তা করা হয়েছিল। ১৯৯১ সালে নির্বাচনী প্রচারণার সময় দুই প্রধান রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি পরস্পরের প্রতি তেমন আক্রমণাত্মক ছিল না, যা সেই সময়ের সংবাদপ্ত্র পর্যালোচনা করে আমরা জানতে পারি। আওয়ামী লীগ, বিএনপি এবং বামপন্থী পাঁচ দলীয় জোট নির্বাচনে অংশ নেয়। আওয়ামী লীগ সেবার নির্বাচনে জয়লাভের বিষয়ে বেশ আত্মবিশ্বাসী ছিল। সংবাদপত্র হতে শেখ হাসিনার নানা উদ্ধৃতি হতে সেসবের প্রমান মেলে। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে দুই তৃতীয়াংশ আসনে জয়লাভের ব্যাপারে আশা প্রকাশ করেন তিনি। অন্যদিকে বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া নির্বাচনী প্রচারণায় জয়ের আশা যেমন প্রকাশ করেছেন, তেমনি আওয়ামী লীগ সম্পর্কে সতর্কবার্তাও উচ্চারণ করেছেন। ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে ভোট দেওয়ার জন্য বিপুল সংখ্যক মানুষ ভোটকেন্দ্রে যায়। সাড়ে ছয়কোটি ভোটারের মধ্যে ৭০ শতাংশ লোকের ভোট জমা পড়ে। কোথাও নির্বাচনকে ঘিরে কোন সহিংসতা দেখা যায় নি। এই নির্বাচনে বিএনপি ১৪০ টি, আওয়ামীলীগ  ৮৪ টি, জাতীয় পার্টি ৩৫ টি এবং জামায়াতে ইসলামী দল ১৮ আসনে জয় পায়। নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে বিরোধী দলের নেত্রী শেখ হাসিনা বলেন, বিএনপির করা সূক্ষ্ম কারচুপির ফলে আওয়ামী লীগ পরাজিত হয়েছে। 

১৯৯৬ এর ফেব্রুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচন

১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি বিএনপি সরকার এক বিতর্কিত নির্বাচনের আয়োজন করলে দেশের সকল বড় রাজনৈতিক দল তা বয়কট করে। আওয়ামী লীগ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি জানায়। আওয়ামী লীগের এই দাবি সমর্থন করে জাতীয় পার্টি এবং জামায়তে ইসলাম। তবে বিএনপি সাংবিধানিক যুক্তি দেখিয়ে বলতে থাকে যে নির্বাচন তখনই করতে হবে। শেষ অবধি আন্দোলন ও বয়কটের মুখে ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়। নির্বাচনের দিন অন্তত ১০ জন নিহত হবার খবর জানা যায়। একতরফা নির্বাচনে ভোটারদের উপস্থিতি ছিল হাতেগোণা। ফলতঃ বিএনপি সহজেই নির্বাচিত হয়ে যায়।

১৯৯৬ এর জুন মাসের নির্বাচন 

সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশের নির্বাচনের ইতিহাসের সবচেয়ে জোরালো লড়াই হয়েছিল। আওয়ামী লীগ পেয়েছিল ১৪৬ টি আসন, বিএনপি পেয়েছিল ১১৬ টি আসন, জাতীয় পার্টি পেয়েছিল ৩২ টি আসন এবং জামায়াতে ইসলামী পায় ৩ টি আসন। ১৯৯৬ এর ৩ মার্চ খালেদা জিয়া তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিল পাস করানোর কথা বলেন এক ভাষণে। তবে বিরোধী দলগুলি তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যেতে থাকে এর মধ্যেই। ১৯৯৬ এর ২৬ মার্চ ভোররাতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিল সংসদে পাস হয়। ৩০ মার্চ খালেদা জিয়া পদত্যাগ করলে ষষ্ঠ সংসদীয় কার্যক্রম বন্ধ হয়। নানা ঘটনাবহুলতার মধ্য থেকে ১৯৯৬ এর ১২ জুন সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে আওয়ামী লীগ তাতে বিজয় লাভ করে। বিএনপি এ নির্বাচনের ফল নিয়ে খুশি ছিল না তা বলাই বাহুল্য। তবে, আন্তর্জাতিক নির্দলীয় পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলি জানায় নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়েছে। 

২০০১ এর নির্বাচন: বিএনপির বিজয়

বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী দল জোটবদ্ধ হয়ে এ নির্বাচনে অংশ নেয়। ক্ষমতার মেয়াদ পূর্ণ করে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে হাসিনা সরকার। পরবর্তীতে যদিও শেখ হাসিনা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। বিএনপি ও আওয়ামী লীগ দুই দলই আশা করেছিল তারা নির্বাচন জিতবে। তবে দিনশেষে দেখা যায় বিএনপি জয়লাভ করে। আওয়ামী লীগ নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে। তারা সংসদীয় কার্যক্রমে যোগ দিতেও আসে নি। পরে যদিও বহু তর্ক-বিতর্ক, সমঝোতার পর তারা সংসদে যোগ দেয়। এই নির্বাচনের পর দেশের বিভিন্ন জায়গায় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা, বাড়ি ঘরে অগ্নিসংযোগ, লুটপাটের ঘটনা ঘটে৷ বিএনপি সরকারকে পরবর্তীতে এ নিয়ে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করতে দেখা যায় নি। 

২০০৮ এর নির্বাচন আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তন 

পর্যবেক্ষকদের মতে ২০০৮ এর নবম নির্বাচন বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত শেষ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন। আওয়ামী লীগ এতে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় জয়লাভ করে। ২০০৭ এর জানুয়ারি মাসে দেশের রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করে সেনাবাহিনী। এছাড়াও নতুন তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয় ড. ফখরুদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে। তিনি আভাস দেন সাধারণ নির্বাচন হতে ২ বছর সময় লাগতে পারে। কারণ, ছবিসহ ভোটার কার্ডের ব্যবস্থা করা হবে। এছাড়া, দুদক বা দুর্নীতি দমন কমিশন সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় দুর্নীতি দমন অভিযান শুরু করে। আওয়ামী লীগের বিভিন্ন প্রচারণায় ডিজিটাল বাংলাদেশ শ্লোগান ও রূপরেখা তরুণ ভোটারদের আকৃষ্ট করে। বিএনপি ও খালেদা জিয়া আওয়ামী লীগের তুলনায় এই নির্বাচনে ছিল বেশ অগোছালো। এসময় খালেদা জিয়া চাচ্ছিল তার দুই ছেলের মুক্তি ও তাদের বিদেশে চিকিসার ব্যবস্থা করা হয় যাতে। এই শর্তেই তিনি ২০০৮ এর নির্বাচনে অংশ নেন। আওয়ামী লীগের এই নির্বাচনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রচারের অংশ ছিল যুদ্ধাপরাধীদের বিচার। ২০০৮ এর এই নির্বাচনে ৮৬.২৯% ভোট পড়ে। ২৩০ আসনে জয়লাভ করে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ। বিএনপি পায় মাত্র ৩০ টি আসন। নির্বাচনের ফল মেনে নিতে না পেরে বিএনপি দল থেকে কারচুপির অভিযোগ তোলা হয়। আত্মবিশ্বাসী আওয়ামী লীগও হয়তো ভাবে নি, জয়ের ব্যবধান এত বেশি হবে। 

Show More

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button