সিরিয়া ও তুরস্ক ভূমিকম্প বাড়ছে হতাশা আর ক্ষোভ

সিরিয়া ও তুরস্ক ভূমিকম্প

একদিকে যেমন ধ্বংসস্তূপের জমেছে পাহাড় , অনপরদিকে প্রকৃতিতে ভয়াবহ শীত এর থাবা।ফলে তুরস্ক ও সিরিয়ায় ধ্বংসাত্মক ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ এর দুঃখের মাত্রা বেড়েছে।অনেকেই এখনো ধ্বংসস্তূপের মাঝে আটকে পড়ে আছে। বেঁচে যাওয়া ঘর হারানো মানুষদের, উদ্ধারকর্মীদের, ও ক্ষতিগ্রস্তদের লড়তে হচ্ছে প্রচণ্ড ঠান্ডা ও ক্ষুধার সাথে  । চরম প্রতিকূল আবহাওয়ায় বিলম্বিত হচ্ছে উদ্ধারকাজ।

ফলে যত  সময় ব্য হচ্ছে, ধ্বংসস্তূপ থেকে জীবিত ব্যক্তিদের উদ্ধারের আশা ততই ক্ষীন হয়ে আসছে। যা এই পরিস্থিতি ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে ক্ষোভ ও হতাশা তৈরি করেছে। তাঁদের মতে, সরকার যথাসময়ে যথাযথভাবে সাড়া দিতে ব্যর্থ হয়েছে, হচ্ছে। এ কারণে ভূমিকম্পের পরে ধ্বংসস্তূপ থেকে যাঁদের জীবিত উদ্ধারের সম্ভাবনা রয়েছে, তাঁদেরও মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।

জাতিসংঘে সিরিয়ার রাষ্ট্রদূত বলেন, “ভয়াবহ এই ভূমিকম্পের পর দ্রুত উদ্ধারকাজ পরিচালনার জন্য তার সরকারের সক্ষমতা এবং প্রয়োজনীয় উপকরণ ও সরঞ্জামের অভাব রয়েছে। এক দশকের বেশি সময় ধরে চলমান গৃহযুদ্ধ ও পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকায় সিরিয়া এই সক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি।”

সিরিয়া ও তুরস্ক ভূমিকম্প বেড়েই চলেছে মৃতের সংখ্যা 

 আজ বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত সিরিয়া তুরস্ক ভূমিকম্পে ১৫,৩৮৩ জন প্রাণ হারিয়েছেন বলে জানা গেছে। এর মধ্যে তুরস্কে  ১২,৩৯১ জন মারা গেছেন। আর সিরিয়ায় ২,৯৯২ জন।

রিখটারে ৭.৮ মাত্রার এ ভূমিকম্পে দুই দেশে মৃত’র সংখ্যা ব্যাপক ক্রমবর্ধমান। দুই দেশের সরকারী হিসাবে,, প্রথম দিন শেষে মৃত’র সংখ্যা সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৫০০’র বেশি। ২য় দিন এই সংখ্যা ৬,৫০০ ছাড়িয়েছে। এখন পর্যন্ত এ সংখ্যা ১৫ হাজার এরও বেশি। ভূমিকম্পে তুরস্কের ১০টি ও সিরিয়ার ৪টি প্রদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

কোথায় রাষ্ট্র? কোথায় সরকার? দুই দিন ধরে তারা কোথায় ছিল? আমাদের এটা (উদ্ধারকাজ) করতে দিন। আমরাই তাঁদের বের করে আনতে পারব।

সাবিহা আলিনাক, তুরস্কের হাতাই প্রদেশের মালাতায়া শহরের বাসিন্দা।

এরদোয়ানের সফর ক্ষোভ

উদ্ধারকাজ ধীরগতির হওয়া নিয়ে ক্ষোভ ঝাড়ছেন  নিখোঁজদের  স্বজনেরা। ভূমিকম্পের পর প্রাথমিকভাবে যেসব পদক্ষেপ নেওয়া দরকার ছিল, সেসব নিতে দেরি হচ্ছে—এমন অভিযোগ তাঁদের।

তুরস্কের হাতাই প্রদেশে এ ঘটনায় ৩,৩০০-এর অধিক মানুষের প্রাণ হারিয়েছে। অধিকাংশই নিখোঁজ। উদ্ধারকাজে ধীরগতির কারণে প্রদেশটির মালাতায়া শহরে ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে আছেন সাবিহা আলিনাকের স্বজন। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘কোথায় রাষ্ট্র? কোথায় সরকার? দুই দিন ধরে তারা কোথায় ছিল? আমাদের এটা (উদ্ধারকাজ) করতে দিন। আমরাই তাঁদের বের করে আনতে পারব।’

রাষ্ট্রপতি রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানও উদ্ধারকাজে ধীরগতির এসব অভিযোগের কথা স্বীকার করেছেন। গতকাল এরদোয়ান কাহরামানমারাস শহরে যান । সেখানে উদ্ধারকাজ চলছিল পুরোদমে । এ সময় এরদোয়ান সাংবাদিকদের বলেন, “উদ্ধার কার্যক্রম চালাতে গিয়ে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। ভূমিকম্পের কারণে সড়ক ও বিমান যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় এ সমস্যা হচ্ছে। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে উদ্ধারকাজের গতি বাড়বে।”

ভূমিকম্পের পর যাঁদের জীবিত উদ্ধার করা হয়, তাঁদের মধ্যে ৯০ শতাংশ উদ্ধার হন তিন দিনের মধ্যে।

ইলান কেলমান, যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের অধ্যাপক।

জাতিসংঘে সিরিয়ার রাষ্ট্রদূত বলেছেন, “ভয়াবহ এই ভূমিকম্পের পর দ্রুত উদ্ধারকাজ পরিচালনার জন্য তাঁর সরকারের সক্ষমতা এবং প্রয়োজনীয় উপকরণ ও সরঞ্জামের অভাব রয়েছে। এক দশকের বেশি সময় ধরে চলমান গৃহযুদ্ধ ও পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকায় সিরিয়া এই সক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি।”

গুরুত্বপূর্ণ ৭২ ঘণ্টা

সময় যত গড়াচ্ছে, তুরস্ক ও সিরিয়ার ধসে যাওয়া ভবনগুলো থেকে জীবিত মানুষদের উদ্ধারের সম্ভাবনা তত কমে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভূমিকম্পের পর উদ্ধারকাজের জন্য ৭২ ঘণ্টা গুরুত্বপূর্ণ। এ প্রসঙ্গে যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের অধ্যাপক ইলান কেলমান বলেন, ভূমিকম্পের পর যাঁদের জীবিত উদ্ধার করা হয়, তাঁদের মধ্যে ৯০ শতাংশ উদ্ধার হন তিন দিনের মধ্যে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান তেদরোস আধানোম গেব্রেয়াসুস সতর্ক করে বলেছেন, ভূমিকম্পে আহত ও ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে থাকা মানুষের জন্য সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। সংস্থাটির আশঙ্কা, ভয়াবহ এ ভূমিকম্পে দুই দেশে মৃত মানুষের মোট সংখ্যা ২০ হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে।

তবে এটাও নির্ভর করে ঘটনাস্থলের আবহাওয়া, কড়াঘাত ও উদ্ধারকারী দলের কাজের গতির ওপর। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব বিবেচনায় তুরস্ক ও সিরিয়া পিছিয়ে আছে। দেশ দুটিতে যেমন পর্যাপ্ত উদ্ধারকর্মী নেই, তেমনি যন্ত্রপাতির সংকট রয়েছে। আবার আবহাওয়াও বৈরী।

১৮ মাসের মাশাল জীবিত উদ্ধার

তুরস্কের দক্ষিণাঞ্চলের কাহরামানমারাস প্রদেশে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছিলেন কিরাচাকালি দম্পতি। সঙ্গে তাঁদের ১৮ মাস বয়সী মেয়ে মাশালও ঘুমাচ্ছিল। এ সময় হঠা কেঁপে ওঠে চারপাশ। ভবন দুলতে থাকে। তরুণ দম্পতি কিছু বুঝে ওঠার আগেই ধসে পড়ে ভবনটি। ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়েন স্বামী-স্ত্রী এবং তাঁদের শিশুসন্তান।

ভূমিকম্পের কিছুক্ষণ পর ধ্বংসস্তূপ থেকে বের হন ওমের কিরাচাকালি। কিন্তু ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে থাকেন তাঁর স্ত্রী ইয়েলিজ কিরাচিকালি ও মেয়ে মাশাল। এরপর কেটেছে ৫৫ ঘণ্টা। অবশেষে গতকাল বুধবার ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে মাশালকে উদ্ধার করা হয়েছে। তবে ইয়েলিজ এখনো সেখানে। তাঁকে উদ্ধার করার চেষ্টা চলছে।

তুরস্কের সংবাদমাধ্যমের খবর, ইয়েলিজ বেঁচে আছেন। তাঁর সঙ্গে কথা হয়েছে উদ্ধারকর্মীদের। ইয়েলিজ উদ্ধারকর্মীদের জানিয়েছেন, ভূমিকম্পে ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ার পর থেকে মাশালকে নিজের বুকের দুধ খাইয়ে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করেছেন তিনি

Show More

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button