লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠার স্বপ্নযাত্রা থেকে সাহিত্যঘর গণগ্রন্থাগার

“ছোটকালের বইপড়ার শখ আর নিজের ব্যক্তিগত পাঠাগারের অভাব থেকেই পাবলিক লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠার স্বপ্নযাত্রা শুরু”

করোনা ভাইরাসের কারণে ২০২০ সালের মার্চ মাসে যখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়, বাড়িতে বসে জুনের দিকে একটা ফেইসবুক পেইজ খুলেছিলাম যা পরবর্তীতে রূপ নেয় একটা অলাভজনক সংগঠনের। পেইজ হতে শুরুতে অনলাইনে বাবা দিবস উদযাপন করলেও সেপ্টেম্বরে এসে জলবায়ু ধর্মঘট ও বৃক্ষরোপণ করি যাতে সংগঠনের কার্যক্রম নতুন মোড় নেয়।
 
আমার কয়েকজন বন্ধু-বান্ধবকে পাশে পেয়ে পুরোদমে কাজ করছিলাম। এর মধ্যে মাথায় গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠার ভূত চাপে। চিন্তা করি, এই লকডাউনে মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কিশোর-কিশোরীরা মোবাইল ফোনে আসক্ত হয়ে পড়ছে। নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয় হচ্ছে। এ থেকে প্রতিকার পেতে হলে প্রয়োজন মানসম্মত বিনোদন যার মাধ্যমে সময় কাটানো যাবে। বই হচ্ছে এর সর্বোত্তম হাতিয়ার আর গ্রন্থাগার তার উপযুক্ত স্থান।
 
গ্রন্থাগারের আমার এই স্বপ্ন পূরণ হলে এর সুফল সমগ্র রামু উপজেলার মানুষ ভোগ করবে। রামুর বইপ্রেমীরা পাবে বইয়ের দুনিয়া। বই নিয়ে কথা হবে, সমালোচনা হবে। রামুর মানুষ বইয়ের আলোয় অনেক কিছু শিখবে। সাহিত্য প্রবাহিত হবে।
 
নিজের কাছে তখন মাত্র দশটা বই ছিল। দশটা বই দিয়েই যাত্রা শুরু করি। ১৪ অক্টোবর, ২০২০ ইং ফেসবুকে “আমার পাঠাগার” নাম দিয়ে পেইজ খুলি। ফেসবুক-ম্যাসেঞ্জারে সদস্য সংগ্রহ করি। সদস্যদের বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে বই দিয়ে আসতাম। পড়া শেষ হলে আবার বই আনতে যেতাম। এভাবেই চলছিল আমার পাঠাগারের সূচনাযাত্রা।
 
ইচ্ছা ছিল রামু উপজেলার সকলে এই পাঠাগারে নিজের নতুন-পুরাতন বই যুক্ত করবে আর একে অন্যের বই পড়ার মাধ্যমে পাঠাগার সচল রাখবে। কিন্তু আমার সে আশা পূর্ণ হয়নি। তবে আমি আশা হারাইনি, বরং সাহস বেড়ে গিয়েছিল।
 
১৩ নভেম্বর, ২০২০ ইং হুমায়ূন আহমেদ এর ৭২ তম জন্মবার্ষিকী পালন করি পাঠাগারের সদস্যরা তাঁর লেখা বই পড়ে এবং ৭২ টি গাছ রোপণ করার মাধ্যমে। ডিসেম্বরের শেষের দিকে সিদ্ধান্ত নিই, আমার স্বপ্নের পাঠাগারকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিব। বন্ধুদের সাথে শেয়ার করি। সকলে সম্মতি জানালে পূর্ণ মনোবল ও সাহস নিয়ে আমরা এগিয়ে চলতে সংকল্পবদ্ধ হই।
 
আমার পাঠাগারের নাম পাল্টে “সাহিত্যঘর গণগ্রন্থাগার” করি। নামটা সকলের বেশ পছন্দ হয়। অতঃপর সকল বাধা অতিক্রম করে ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ইং সাহিত্যঘর গণগ্রন্থাগার উদ্বোধন করি এবং কক্সবাজার জেলার রামু উপজেলার জনগণসহ সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করি।
 
সাহিত্যঘর গণগ্রন্থাগার গড়ে উঠেছে পর্যটন নগরী কক্সবাজার জেলার রামু উপজেলায়। রম্যভূমী রামুর বাঁকখালী নদীর তীরে বসে আমরা আমাদের শুরুর কার্যক্রম পরিচালনা করেছি। আমাদের প্রথম দিকের বইপড়া কর্মসূচী সংঘটিত হয়েছে বাঁকখালীর তীরে, ৩০০ বছরের পুরোনো লাওয়ে জাদির চূড়ায়, রামু স্টেডিয়ামের মাঠে।
 
আমরা রাস্তায় আমাদের কার্যক্রম শুরু করে চার দেয়ালের ভেতর প্রবেশ করেছি। রামু উপজেলার প্রাণকেন্দ্র চৌমুহনীর পার্শ্ববর্তী গ্রাম মেরংলোয়ায় রামু কেন্দ্রীয় সীমা মহাবিহারের পাশেই সাহিত্যঘর গণগ্রন্থাগার এর অবস্থান। নিজেদের পকেট খরচের টাকায় আমাদের এ পাঠাগার, স্থানীয় কয়েকজন শিক্ষক ও চাকরিজীবী আমাদের ডোনেশন প্রদান করেন। আমরা তাঁদের কাছে কৃতজ্ঞ।
 
সাহিত্যঘর গণগ্রন্থাগার পরিচালিত হয় আমাদের সংগঠন “ইয়ুথ পজিশন বাংলাদেশ” এর মাধ্যমে। সংগঠনের সদস্যরা মাসিক ১০০ টাকা করে ডোনেশন দিয়ে সংগঠন ও পাঠাগারের যাবতীয় খরচ বহন করি। ইয়ুথ পজিশন বাংলাদেশ এর কেন্দ্রীয় কমিটি সরাসরি পাঠাগার পরিচালনা করে এবং সাহিত্যঘর গণগ্রন্থাগার এর কার্যনির্বাহী পরিষদ যাবতীয় কার্যক্রম বাস্তবায়ন করে।
 
ইয়ুথ পজিশন বাংলাদেশ এর সাথে শুরু থেকে আছে রফিকুল ইসলাম সাঈদী, মেহেদী হাসান, সজীব বড়ুয়া, সুবি বড়ুয়া, অভিপ্সা বড়ুয়া মেঘলা ও তামান্না আলম। তারা সকলে সাহিত্যঘর গণগ্রন্থাগার এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত এবং পাঠাগারের প্রয়োজনে কার্যনির্বাহী পরিষদে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দায়িত্বে নিযুক্ত ছিল। এছাড়াও ইয়ুথ পজিশন বাংলাদেশ এর সাথে যুক্ত আছে তাহিয়ান কামাল, মোবারক হোসেন, মুশফিকুল ইসলাম সিফাত, আরজিনা নেওয়াজ মাহি, এছেন রাখাইন, বৃষ্টি বড়ুয়া, অতন্দ্রীলা বড়ুয়া রিয়া, কলি বড়ুয়া, মোঃ মোরশেদ, মাইমুনা মাহমুদ, বিজয় বড়ুয়া ও সুমন্ত বড়ুয়া। ইয়ুথ পজিশন বাংলাদেশ এর প্রত্যেক স্বেচ্ছাসেবক সাহিত্যঘর গণগ্রন্থাগার এর সাথে সরাসরি যুক্ত।
 
সাহিত্যঘর গণগ্রন্থাগার এ বর্তমানে প্রায় দুই হাজার বই ও শতাধিক পাঠক রয়েছে। প্রতিদিন একটি করে জাতীয় দৈনিক ও দুইটি স্থানীয় দৈনিক পত্রিকা পাঠাগারে রাখা হয়। মাসিক বিজ্ঞানচিন্তা ও কিশোর আলো ম্যাগাজিন পাঠাগারে যুক্ত হয়। পাঠাগারে বসে যে কেউ বই ও পত্রিকা পড়তে পারেন। এছাড়াও পাঠাগারে আছে দাবা খেলার বোর্ড। প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত খোলা থাকে পাঠাগার। কেউ যদি বই বাড়িতে নিয়ে যেতে চায় তবে তাকে একটি সিকিউরিটি ফি জমা দিয়ে পাঠাগারে সদস্য হতে হয় এবং নামমাত্র মাসিক চাঁদা দিতে হয়। স্থানীয় জনগণ সাহিত্যঘর গণগ্রন্থাগার এর প্রতিষ্ঠা ও এর কার্যক্রমে অত্যন্ত খুশি। তারা পাঠাগারের পাশে থাকার আশ্বাস প্রদান করেছেন।
 
সাহিত্যঘর গণগ্রন্থাগার এর জন্য সারা বাংলাদেশ হতে পাঠক, লেখক ও শুভাকাঙ্ক্ষীসহ অনেকেই বই পাঠিয়েছেন এবং এখনও পাঠাচ্ছেন। তাঁদের নাম বলে শেষ করতে পারবো না। ঠিক তেমনি তাঁদেরকে ধন্যবাদ জানিয়েও তাঁদের গুণ শোধ করতে পারবো না। তাঁরা আজীবন আমার ও সাহিত্যঘর গণগ্রন্থাগার এর স্মৃতিতে থাকবে। “আমার পাঠাগার হতে সাহিত্যঘর গণগ্রন্থাগার” এর যাত্রায় যারা সাথে ছিলেন তাদেরকে আমি আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। গ্রন্থাগারের জন্য যারা বই পাঠিয়েছেন এবং আর্থিকভাবে যারা সহযোগিতা করেছেন তাদের প্রতি শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। সাহিত্যঘর গণগ্রন্থাগার পরিবার সকলের কাছে চিরকৃতজ্ঞ থাকবে।
 
বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করার এবং শহরকেন্দ্রিক স্বেচ্ছাসেবীতার চেয়ে গ্রামকেন্দ্রিক গুরুত্ব দিয়ে “ইয়ুথ পজিশন বাংলাদেশ” এর যাত্রা শুরু হয়। সারা বিশ্বের তরুণ উদ্যোক্তা ও সমাজ পরিবর্তকদের নিয়ে একসাথে কাজ করার উদ্দেশ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে কাজ করে আসছে ইয়ুথ পজিশন বাংলাদেশ। ইয়ুথ পজিশন বাংলাদেশ প্রধানত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা এর সমর্থনে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পরিবেশ নিয়ে কাজ করছে। তরুণদের সাথে নিয়ে অসহায়, সুবিধাবঞ্চিত ও পথশিশুদের জন্য কাজ করা আমাদের লক্ষ্য।
 
সাহিত্যঘর গণগ্রন্থাগার এর স্বেচ্ছাসেবকগণ শুরু থেকে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে জলবায়ু ধর্মঘট ও বৃক্ষরোপণ করে আসছে। শুরুতে খোলা জায়গায় বই পাঠ কর্মসূচী ও পাঠক আড্ডার আয়োজন করা হতো। মহান বিজয় দিবসের আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে ছুটে যায় বাইপাস বেদে পল্লীর সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের কাছে। মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশ সম্পর্কে জানিয়ে তাদের ভেতর জ্ঞান অর্জনের তৃষ্ণা জাগিয়ে তাদেরকে বিজয়ের আনন্দে আনন্দিত করেছে। পরপর দুইবার সাহিত্যঘর গণগ্রন্থাগার এ বুক রিভিউ প্রতিযোগিতার আয়োজন করে বিজয়ীদের বই ও নগদ অর্থ উপহার দেওয়া হয়।
 
বইমেলার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা বোঝাতে সাহিত্যঘর গণগ্রন্থাগার এর উদ্যোক্তা ও পাঠকদের সাথে নিয়ে কক্সবাজারে আয়োজিত অমর একুশে বইমেলা ২০২১ পরিদর্শন করা হয়। ইয়ুথ পজিশন বাংলাদেশ এর সহযোগিতায় ২০২১ সালে রামু কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ, ২০২২ সালে চৌমুহনীতে বয়স্ক পথিক ও রিকশাওয়ালাদের মাঝে এবং ২০২৩ সালে চট্টগ্রামের ষোলশহর ও মুরাদপুরে রোজার ইফতার বিতরণ করা হয়। ইউনিভার্সিটি অব সাইন্স এন্ড টেকনোলজি চিটাগং (ইউএসটিসি) এর বায়োকেমিস্ট্রি এন্ড বায়োটেকনোলজি ডিপার্টমেন্ট আয়োজিত বসন্ত উৎসবে সাহিত্যঘর এর পক্ষ থেকে ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি ও বইমেলা আয়োজন করা হয়েছে।
 
জাতীয় শোক দিবস ২০২৩ উপলক্ষে বঙ্গবন্ধু গবেষণা সংসদ ও উপজেলা প্রশাসন, রামু, কক্সবাজার এর সহযোগিতায় সাহিত্যঘর গণগ্রন্থাগার এর উদ্যোগে শিশু-কিশোরদের চিত্রাঙ্কন, রচনা ও বঙ্গবন্ধুর ভাষণ আবৃত্তি প্রতিযোগিতা আয়োজন করা হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে নিরব কর্মসূচীর অংশ হিসেবে সাহিত্যঘর গণগ্রন্থাগারে প্লাকার্ড টাঙানো হয়েছে। বিতর্ক ক্লাব ও বিজ্ঞান ক্লাব গঠনের পাশাপাশি সাহিত্যঘর গণগ্রন্থাগার এ যুক্ত করা হবে ইংরেজি ভাষা ও কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কোর্স। মেডিকেল, ইন্জিনিয়ারিং ও বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার্থীদের জন্য চালু করা হবে শিক্ষা সহায়তা কেন্দ্র।
 
সাহিত্যঘর গণগ্রন্থাগার ইয়ুথ পজিশন বাংলাদেশ এর একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রকল্প যা প্রাথমিকভাবে পাইলট প্রকল্প হিসেবে পাঁচ বছরের জন্য প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। পরবর্তীতে সাহিত্যঘর গণগ্রন্থাগার আর-ও বৃহৎ পরিসরে গড়ে তোলা হবে। কক্সবাজারগামী সকলকে সাহিত্যঘর গণগ্রন্থাগার পরিদর্শনের আমন্ত্রণ জানাচ্ছি এবং ইয়ুথ পজিশন বাংলাদেশ ও সাহিত্যঘর গণগ্রন্থাগার এর সাথে যুক্ত হতে চাইলে কিংবা আমাদের কাজে অংশগ্রহণ অথবা অবদান রাখতে চাইলে আমাদের ওয়েবসাইট youthposition.com এ যোগাযোগ করুন। দেশ-বিদেশ হতে যে কেউ আমাদের পাঠাগারে ডাক ও কুরিয়ারযোগে বই পাঠাতে পারেন।
 
বই পাঠানোর ঠিকানাঃ
সাহিত্যঘর গণগ্রন্থাগার, রামু-৪৭৩০, কক্সবাজার
মোবাইলঃ ০১৬১৪৪৩৪২৬৩
 
“সাহিত্য প্রবাহিত হোক, পৃথিবী বইয়ের হোক” এই আমাদের স্লোগান। জয়তু সাহিত্যঘর৷
 
রিমন বড়ুয়া 
চট্টগ্রাম, বাংলাদেশ 
 
 
 
Show More

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button