আপনি কি জানেন? নারায়ণগঞ্জ কিসের জন্য বিখ্যাত

আপনি কি জানেন? নারায়ণগঞ্জ কিসের জন্য বিখ্যাত

নারায়নগঞ্জ, শব্দটা শুনলেই ঐতিহ্য ও ইতিহাস মাখা একটা শহরের চিত্র মনস্পটে ভেসে উঠবে হয়তো। হ্যা আজ আলোচনা করবো ঢাকার প্রতিবেশী ও প্রাচ্যের ড্যান্ডিখ্যাত নারায়ণগঞ্জ কে নিয়ে জানবো নারায়ণগঞ্জ কেনো বিখ্যাত 

নারায়ণগঞ্জ জেলার রয়েছে সুদীর্ঘ ইতিহাস ও বর্তমানেও এই জেলাটি দেশের অন্যতম ইকোনোমিক জোন হিসেবে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছে। কাউকে যদি জিজ্ঞেস করা হয় যে ” বলুন তো নারায়ণগঞ্জ কেনো বিখ্যাত?”

উত্তরে হরেকজন হরেক কিছুর উদাহরণ দিবে হয়তো। কারন একমাত্র নির্দিষ্ট কিছুর জন্য নারায়ণগঞ্জ কখনোই বিখ্যাত ছিলোনা। বরং নারায়ণগঞ্জ সর্বদা বিখ্যাত হয়েছে তার সবকিছু হতে প্রাপ্ত সকল নৈপুণ্য মিলিয়ে। এজন্যই সেই ইংরেজ আমল থেকে শুরু করে বর্তমানের নারায়ণগঞ্জ দাড়িয়ে রয়েছে খুবই সমৃদ্ধ ইতিহাস ও ঐতিহ্য নিয়ে।

নারায়গঞ্জ কেনো বিখ্যাত এ টপিকে যাওয়ার আগে চলুন একবার এই নারায়ণগঞ্জ এর পূর্বের কিছু ঘটনা জানা যাক। ১৭৬৬ সালে বিকন লাল পান্ডে যিনি লক্ষী নারায়ণ নামেও পরিচিত, তিনি  ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নিকট থেকে বর্তমান নারায়ণগঞ্জ অঞ্চলের মালিকানা গ্রহন করেন। তিনি প্রভু নারায়ণের সেবার ব্যয় বহনের জন্য একটি দলিলের মধ্যমে শীতলক্ষ্যা নদীর পাশে অবস্থিত মার্কেটকে দেবোত্তর সম্পত্তি হিসেবে ঘোষনা করেন। পরবর্তীকালে এই স্থানের নাম লক্ষী নারায়ণের নাম অনুসারে নারায়ণগঞ্জ রাখা হয়। ১৭ ও ১৮র মাঝের সময় পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জ নামের কোনো নগরীর অস্তিত্ব প্রাচীন বাংলার মানচিএে ছিলো না। তবে প্রাচীন বাংলার রাজধানী সোনারগা এই নারায়নগঞ্জেই অবস্থিত। এছাড়াও ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে ২৬ মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণার পরদিন ২৭ মার্চ পাকবাহিনী সমরাস্ত্র নিয়ে নারায়ণগঞ্জে প্রবেশের সময়ে ফতুল্লার মাসদাইর এলাকায় স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের ২৪ ঘন্টার প্রবল বাধাঁয় পিছু হটেছিলো যা ছিলো দেশের প্রথম সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ।

 

নারায়ণগঞ্জ

 

২৯২ বর্গমাইল এলাকা নিয়ে ১৯৮৪ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি নারায়ণগঞ্জকে জেলা হিসেবে ঘোষণা করা হয় যা ৫টি উপজেলা নিয়ে গঠিত। সর্বশেষ ২০১১ সালের ৫ই মে বন্দর থানার কদমরসুল ও সিদ্ধিরগঞ্জ পৌরসভা,সদর পৌরসভা নিয়ে গঠিত হয়  নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন।

মানচিত্রের আকার বিবেচনায় নারায়নগঞ্জ বাংলাদেশের ২য় ক্ষুদ্রতম জেলা ও বাংলাদেশের ৭ম সিটি কর্পোরেশন। তবে ২য় ক্ষুদ্রতম জেলা হলেও নারায়ণগঞ্জ কে সর্বদাই ব্যবসা ও বানিজ্যিক জোন হিসেবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।

কারন চট্টগ্রামের পর নারায়ণগঞ্জই দেশের ২য় বৃহত্তর বাণিজ্যিক নগরী। তাছাড়া এই শহরটা ব্যবসায়িক যোগাযোগ রক্ষার্থেও অনেক গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে কারন দেশের অর্থনীতির লাইফলাইন (ঢাকা-চট্টগ্রাম)মহাসড়ক এই নারায়ণগঞ্জের ভেতর দিয়েই সামনে এগিয়েছে। এছাড়াও চট্টগ্রাম,সিলেট বিভাগের যানবাহন ও বরিশাল বিভাগের সকল নৌযান এই জেলার মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া নদনদী ও রোডের ওপর দিয়েই যাতায়াত করে।

 

আর দেশের ২য় বৃহত্তর ভোগ্যপণ্যের পাইকারি বাজার নিতাইগঞ্জ এখানেই অবস্থিত। পৃথিবীর ১ম এবং ২য় সর্বশ্রেষ্ঠ ২টি পরিবেশবান্ধব শিল্পকারখানা (রেমী হোল্ডিংস ও প্লামি ফ্যাশন) নারায়নগঞ্জেই  অবস্থিত।

শম্পা ফ্লাওয়ার মিল নামক দেশের সর্ববৃহত ফ্লাওয়ার মিলটাও নাকি এই নারায়ণগঞ্জলই অবস্থিত।

এগুলো ছাড়াও নারায়ণগঞ্জে এমন অনেক কিছুই স্থাপিত হয়েছিলো যা দেশের সার্বিক জীবনযাত্রার মানে ১ম বারের মতো নতুন মাত্রা যোগ করতে সক্ষম হয়েছিলো। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে পূর্ব বাংলার সর্বপ্রথম মিটারগেজ রেলপথ যা শুরু হয়েছিলো নারায়ণগঞ্জ থেকেই। তারপর উদাহরণ হিসেবে মসলিন কাপড়ের কথাও বলা যায়। কারন একদা মসলিন ও জামদানীর পীঠস্থান বলা হতো এই নারায়ণগঞ্জ কে। আরেকটা বিষয় না বললেই না তা হচ্ছে। বাংলার প্রথম ডাক ও টেলিফোন সার্ভিস এর যাত্রা এই নারায়ণগঞ্জ থেকেই শুরু হয়। এছাড়াও অনেক স্বনামধন্য শিল্প পরিবারের শুরু এখান থেকেই যাম্মধ্যে অতি চেনা নামগুলো হচ্ছে ফকির গ্রুপ, ACI, সুপার স্টার, প্যারাডাইস, এসরোটেক্স, নীট কনসার্ন, আনন্দ শিপইয়ার্ড এন্ড স্লিপওয়েজ, মোল্লা সল্ট, সিটি গ্রুপ, মেঘনা গ্রুপ ও BSI। তবে নারায়ণগঞ্জের রয়েছে এক বিশাল রেকর্ড। আর সে রেকর্ড টা হয়েছিলো একটি জাহাজ কে ঘিরে যার নাম স্টেলা মেরিস। এটিই বাংলাদেশের প্রথম রপ্তানিকৃত বাণিজ্যিক জাহাজ যা তৈরী হয়েছিল এই নারায়ণগঞ্জেই।

এতেক্ষন তো অতীতের ব্যবসায়িক স্বর্ণযুগ নিয়ে আলোচনা হলো। তবে এখন কেমন আছে নারায়ণগঞ্জ এর অর্থনৈতিক পরিস্থিতি? চলুন সেটাও দেখে নেয়া যাক

 

দেশের সর্ববৃহৎ নদীবন্দর যেহেতু নারায়ণগঞ্জেই অবস্থিত তাই নদীঘেষা এই অঞ্চলে গড়ে উঠেছে অনেক মিল ও ইন্ডাস্ট্রি। শিল্প এলাকাটাও নদীর পাড়েই গড়ে উঠেছে বিশেষকরে পোশাক তৈরির গার্মেন্টসগুলো। দেশের পোশাকশিল্পের আতুরনিবাস এই নারায়ণগঞ্জ।

বর্তমান বাংলাদেশে নীট পোশাক উৎপাদনে নারায়ণগঞ্জ ৭০% এর মতো যোগান দিয়ে থাকে।

দেশের সিমেন্ট,ইস্পাত থেকে শুরু করে সর্বোপরি নির্মাণ শিল্পের সিংহভাগ উৎপাদন ও সরবরাহ হয় এখান থেকেই। আর যেহেতু এদিকে আদমজী ইপিজেড অবস্থওত তাই দেশের অন্যতম ইমপোর্ট/এক্সপোর্ট জোন হিসেবে এটি আমদানি রপ্তানি শিল্পে বেশ অবদান রেখে চলেছে সেই দেশ স্বাধীন এর ও বহু আগে থেকেই। নারায়ণগঞ্জই এককভাবে বাংলাদেশের জাতীয় বাজেটের মোট ২০% অর্থ সরবরাহ করে থাকে।

সবমিলিয়ে অর্থনৈতিক দিক বিবেচনায় বাংলাদেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক জেলা এই নারায়ণগঞ্জ।

তবে এর বানিজ্যিক ঐতিহ্য ছাড়াও এর রয়েছে সুদীর্ঘ রাজনৈতিক ঐতিহ্য ও ইতিহাস। আওয়ামী লীগ এর জন্ম এই নারায়ণগঞ্জের ই পাইকপাড়া মিউচুয়াল ক্লাবে। এছাড়াও অবিভক্ত বাংলার প্রথম ক্লাব ছিল ইংলিশ ক্লাব  যা বর্তমানে নারায়ণগঞ্জ ক্লাব নামে পরিচিত

গভীরভাবে যদি আলোকপাত করা হয় নারায়ণগঞ্জ এর দিকে তাহলে দেখা যায় যে এই জেলাটি একাধারে বানিজ্যিক, যোগাযোগ ও রাজনৈতিক সকল কারনেই বেশ গুরুত্বপূর্ণ। সুতরাং নারায়ণগঞ্জ কেনো বিখ্যাত এটার উত্তরে আসলে নিদিষ্ট কিছু কে ফিচার করা সম্ভব হয়না বিশেষ করে যারা ইতিহাস সম্বন্ধে খোজখবর রাখেন তাদের পক্ষে সম্ভব না। একজ্যই অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জেলাটি সেই অতীত থেকে আজ অব্দি হরেক কারনেই বেশ বিখ্যাত বলা চলে।

বাংলাদেশের জাতীয় স্লোগান কি

Show More

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button