৭২ বছর আগে প্রকাশিত ডন ব্রাডম্যান নিয়ে বই পেলো ১৫ মিনিটে

৭২ বছর আগে প্রকাশিত  ডন ব্রাডম্যান নিয়ে বই আসলো ১৫ মিনিটে

তোফাজ্জল হোসেন, আমার জীবনে দেখা এক পান্ডিত্যপুর্ণ শিক্ষক যার জ্ঞানের সীমা ছিলো না কোন। প্রথম স্যারকে চিনি বগুড়া ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজে। স্যার সেখানে বাংলার শিক্ষক ছিলেন। তবে দুনিয়ার তাবত বিষয়ে তার পান্ডিত্য ছিলো অগাধ। আমরা সবে মাত্র স্কুল শেষ করে কলেজে উঠেছি। অদ্ভুতভাবে তোফাজ্জল হোসেন স্যারের চিন্তা, জীবনদর্শন, সংস্কৃতিবোধ, বাচনভঙ্গি —সবকিছুই আমাদের প্রবলভাবে আকর্ষণ করতে থাকে আমাদের।

২০০২ সালে স্যার এর ক্লাসের একটি কথা মনে পরে। তিনি বলেছিলেন, নতুন কোনো শহরে গিয়ে মানুষের দুটি জায়গায় যাওয়া প্রয়োজন। একটি হলো জাদুঘর, অন্যটি লাইব্রেরি বা গ্রন্থাগার। জাদুঘর হলো ইতিহাস, সভ্যতা ও সংস্কৃতির কেন্দ্র। আর লাইব্রেরি মানুষের চিন্তাচেতনা, মননশীলতা ও জ্ঞানের ভান্ডার। এই দুই জায়গাতে গেলেই সেই দেশ সম্পর্কে ভালো ধারণা পাওয়া যায়।
উচ্চশিক্ষার সুবাদে গত বছরের জুলাই-এ আমার স্ত্রী আমাদের সপরিবার অস্ট্রেলিয়ার ব্রিসবেনে নিয়ে যায়। শহরটিতে খারাপ লাগার মতো কিছুই ছিলো না। সবই খুব চমকপ্রদ। কম জনসংখ্যার ছিমছাম এক শহর সাথে চমৎকার আবহাওয়া।

কিছুদিন কাটানোর পরপরই নতুন দেশটি ঘুরে দেখা শুরু করি। তখন মনে হয় তোফাজ্জল স্যারের কথা । মনে মনে সিদ্ধান্ত নিই, ব্রিসবেনের জাদুঘর ও লাইব্রেরি দেখতে যাব। ১১ ই আগস্ট সেই সুযোগ হয়।
লাইব্রেরিতে প্রবেশ করি বিকেল তিনটার দিকে। নদীর তীরে আধুনিক-ছিমছাম ভবন। পড়ার মূল লাইব্রেরির জায়গা ভবনের দোতলায় । সেখানে সাজানো সারি সারি বই। পড়ার টেবিল, টেবিল ল্যাম্প। কম্পিউটারের সামনে বসে আছেন সাহায্যকারী।

ডন ব্রাডম্যান
ডন ব্রাডম্যান

লাইব্রেরি কার্ড মাত্র ১০ মিনিটে

অস্ট্রেলিয়ার অধিকাংশ মানুষই ভিষণ বন্ধু সুলভ আচরণ রাখে, সাথে সাহায্যকারী গুণ। কাউকে সেবা দেওয়ার জন্য তাঁরা মুখিয়ে থাকে বিভিন্ন অফিসে। লাইব্রেরির দায়িত্বে থাকা ভদ্রমহিলাকে আমার পরিচয় দিলাম। আমি তাকে বললাম, এখানে আমি পড়তে এসেছি, অস্ট্রেলিয়া সম্পর্কে জানতে চাই। সাদরে তিনি আমাকে গ্রহণ করলেন। তিনি আমাকে লাইব্রেরি কার্ড করার জন্য বললেন। প্রথমে মনে হলো, কাজটা খুব ঝামেলার! কিন্তু মাত্র ১০ মিনিটে তিনি আমাকে অবাক করে দিয়ে কুইন্সল্যান্ড স্টেট লাইব্রেরির মেম্বারশিপ কার্ড ইস্যু করলেন। দরকার হলো ই-মেইল আইডি, ফোন নম্বর আর বাড়ির ঠিকানা ।

তিনি আরও জানালেন, আমি চাইলে আজই এখান থেকে বই ধার করে বাসায় নিয়ে যেতে পারব। তিন মাস রাখতে পারব। অবাক কাণ্ড! আমার কার্ড হলো ১০ মিনিটে, আমি এক ভিনদেশি, বই নিতে পারব তিন মাসের জন্য!
ঘুমানোর এবং শোয়ার জন্য অদ্ভুত ও আরামদায়ক পরিবেশ ,কার্ড পাওয়া মাত্রই লাইব্রেরিটি ঘুরে দেখতে লাগলাম। চারদিকে পিনপতন নীরবতা। জ্ঞানচর্চায় সবাই মিনজ্জিত।

ঝুলন্ত বারান্দার মতো ভবনের ২য় তলায় একটা স্থান আছে, যা ব্রিসবেন নদীর ওপর দিয়ে চলে গেছে। জায়গাটি একটি বড়সড় ড্রয়িংরুমের মতো । সেখানে বসার জন্য সোফা আছে। সোফায় একজনকে আরামে শুয়ে থেকে ব্রিসবেন নদী আর নদীর অন্য প্রান্তের শহরের রূপ অবলোকন করতে দেখলাম। যেন কোন ছবির দৃশ্য। আমার কাছে অন্তত এমনই মনে হলো। ব্রিসবেন এ দেখা সুন্দর জায়গাগুলোর মধ্যে লাইব্রেরি ভবন থেকে নদী আর শহরের দৃশ্য আমার কাছে সবচেয়ে সুন্দর মনে হয়েছে।

ব্রিসবেন সিটি কাউন্সিল লাইব্রেরিতেও আমি একই ধরনের মনোরম বিশ্রাম করার আরামদায়ক জায়গা , দেখেছি। শহরের পূর্বে টুয়ং নামের একটি জায়গায় বড় শপিং মলে এই লাইব্রেরি অবস্থিত। স্কুল-কলেজফেরত ছেলেমেয়েরা এখানে অধশোয়া হয়ে বই পড়ে। কেউবা ঘুমায়। কেউবা হেডফোন কানে গুঁজে গান শোনে।

ডন ব্রাডম্যান নিয়ে বই পেলাম মাত্র ১৫ মিনিটে

ক্রিকেট, অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় খেলা । খুবই সমৃদ্ধ সংস্কৃতি আছে দেশটির ক্রিকেট এর । সর্বকালের সেরা ক্রীড়াবিদ স্যার ডন ব্র্যাডম্যান ও দেশটির ক্রিকেট ইতিহাস সম্পর্কে একটু পড়াশোনা করার ইচ্ছা হলো আমার। ফেয়ারওয়েল টু ক্রিকেট, স্যার ব্র্যাডম্যানের আত্মজীবনীর নাম। বইটি লন্ডন থেকে ১৯৫০ সালের মে মাসে প্রকাশিত হয়েছিল। বইটির খোঁজ করতে অনলাইনে একটি ফরম পূরণ করে মেইল করলাম। মাত্র ১৫ মিনিটের মধ্যে ৭২ বছর আগে প্রকাশিত বই এসে হাজির।

কারা বেশি পড়তে যান

আমি খুব মনোযোগ দিয়ে ব্রিজবেন স্টেট লাইব্রেরির দুটি তলাই পর্যবেক্ষণ করেছি। আমি লক্ষ্য করি, এখানে স্কুল-কলেজে পড়ে এমন শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি। নারী ও পুরুষের অনুপাতে নারী শিক্ষার্থীরা এগিয়ে থাকবে। আর ভিনদেশি বা অভিবাসীদের মধ্যে বলতে হবে চীনাদের কথা; অর্থাৎ আমি প্রচুর চীনা শিক্ষার্থীকে লাইব্রেরিতে পড়াশোনা করতে দেখেছি।

উল্লেখ্য, অস্ট্রেলিয়ায় চীনা অভিবাসীদের আধিপত্য খুবই প্রবল। রাস্তাঘাটে আপনি দেখতে পাবেন প্রচুর চীনা নাগরিক। আমার ছেলে আয়মান হক যখন তার মায়ের প্রতিষ্ঠান ইউনিভার্সিটি অব কুইন্সল্যান্ড ঘুরতে যায় তখন বলেই বসে, ‘পাপা, এটা কি চীন দেশ!’

হোর্হে লুইস বোর্হেস, একজন আর্জেন্টাইন সাহিত্যিক, দার্শনিক যিনি খ্যাতি অর্জন করেছিলেন স্প্যানিশ ভাষায় ছোটগল্প লিখে। জ্ঞানের প্রাণকেন্দ্র লাইব্রেরি সম্পর্কে বোর্হেস বলেছিলেন, ‘আমি সব সময়ই কল্পনা করেছি, স্বর্গ হবে একধরনের গ্রন্থাগার।’ ব্রিসবেন নদীর পাড়ে বসে কেবলই হোর্হের কথা মনে পড়ছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে ক্যাঁচ ক্যাঁচ করা চেয়ারে বসে ছারপোকার কামড় সহ্য করে পড়াশোনা করা আমার কাছে এই লাইব্রেরিকে স্বর্গই মনে হচ্ছিল। আর মনে হচ্ছিল, এমন সুযোগ-সুবিধার লাইব্রেরি যেন স্বর্গেও থাকে!

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

 

This Video is Collected From Youtube By: Wide World of Sports
Show More

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button