দেখার মতো চট্টগ্রামের দর্শনীয় স্থান সমূহ

চট্টগ্রামের বিখ্যাত স্থান সমূহঃ 

বাংলাদেশের সুন্দর শহরগুলোর মাঝে চট্টগ্রাম শহর অন্যতম। শহরটি এদেশের বানিজ্যিক রাজধানী আয়তনের দিক থেকে বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর এই শহরটিকে প্রকৃতি যেন পাহাড়, সমুদ্রসহ অন্যান্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দিয়ে সাজিয়েছে। চট্টগ্রাম জেলার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে লোকে এই শহরকে প্রাচ্যের রানী হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভড়পুর এই শহরটিতে বেশ কিছু বিখ্যাত স্থান রয়েছে। চলুন জেনে নেয়া যাক চট্টগ্রামের বিখ্যাত স্থানগুলো কি কি।

পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত 

বাংলাদেশের সুন্দর সমুদ্র সৈকতগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত। সৈকতটি চট্টগ্রাম শহর থেকে মাত্র ১৪ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। সৈকতটি  কর্ণফুলী নদী ও সাগরের মোহনায় অবস্থিত। সৈকতটি ৫ কিলোমিটার  বিস্তৃত। পতেঙ্গায় তীর থেকে দূরে দৃশ্যমান ভাসতে থাকা জাহাজের সারি যেন এই সৈকতের সৌন্দর্য কয়েকগুন বাড়িয়ে তোলে। সূর্যাস্ত ও সূর্যোদয়ের সময় যে স্নিগ্ধ পরিবেশ এর সৃষ্টি হয় তা অবলোকন করার জন্য সৈকতে প্রচুর পর্যটকের সমাগম হয়। এছাড়াও সমুদ্রে ঘুরে বেড়ানোর জন্য স্পিডবোটের সুব্যাবস্থা রয়েছে। পর্যটকদের জন্য আরও রয়েছে ঘোড়া ও সী বাইকে চড়ে সমুদের তীরে ঘুড়ে বেড়ানোর সুযোগ। এছাড়াও সমুদ্র থেকে খুব কাছেই অবস্থিত বার্মিজ মার্কেট এ বিক্রি হয় সামুক , ঝিনুক দিয়ে তৈরী নানা রকমের সামগ্রী থেকে শুরু করে চট্টগ্রামের আদিবাসীদের  ঐতিহ্যবাহী নানা রকমের পোশাক , নানান রকমের আচার ও শুটকী, যা পর্যটকদের জন্য আকর্ষনের অন্যতম জায়গা। পর্যটকদের খাবারের জন্য বার্মিজ মার্কেটের খুব কাছেই আছে বিভিন্ন রকমের মুখরোচক স্ট্রিট ফুডের ব্যাবস্থা  

চন্দ্রনাথ পাহাড়

চট্টগ্রামের সীতাকুন্ডে যে কয়েকটি দর্শনীয় স্থান রয়েছে তার মাঝে চন্দ্রনাথ পাহাড় অন্যতম। পাহাড়টি সীতাকুন্ড বাজার থেকে ৪ কিলমিটার পূর্বে অবস্থিত। যারা ট্রেকিং পছন্দ করেন তাদের কাছে পাহাড়টি ব্যাপকভাবে জনপ্রিয়। পাহাড়টিতে ওঠার জন্য দুটি রাস্তা আছে , ডানদিকের রাস্তাটি দর্শনার্থীদের উপরে ওঠার জন্য সিড়ি করে দেয়া হয়েছে, বেশিরভাগ দর্শনার্থীরা এই পথটি বেয়ে উপরে ওঠেন। বামদিকের রাস্তাটি পাহাড়ি পথ , অধিকাংশ পর্যটক যারা ট্রেকিং পছন্দ করেন তারা এই পথটি বেছে নেন। চন্দ্রনাথ পাহাড়ের উচ্চতা প্রায় ১০২০ ফুট। চন্দ্রনাথ পাহাড়ের চূড়ায় উঠলেই দেখা মিলবে একদিকে সমুদ্রের অন্যদিকে সবুজে ঘেরা পাহাড়। দূর থেকে যেসব পর্যটকরা পাহাড়টি পরিদর্শনে যান তাদের থাকার সুবিধার্থে সীতাকুন্ড বাজার এলাকায় ও সীতাকুন্ড থানা সংলগ্ন এলাকায় কিছু হোটেল ও রয়েছে। 

গুলিয়াখালী সমুদ্র সৈকত

গুলিয়াখালী সমুদ্র সৈকতটি সীতাকুন্ড বাজার থেকে ৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। এই সমুদ্র সৈকতটি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের  দিক বিচারে অন্যান্য সমুদ্র সৈকত থেকে অনেকটাই আলাদা সৈকতের একদিকে দিগন্ত বিস্তৃত জলরাশি অন্যদিকে সবুজ মনোরম পাহাড়ের হাতছানি পর্যটকদের এক স্বর্গীয় মোহে আবিষ্ট করে রাখে। এই সমুদ্রের অনেক গভীর পর্যন্ত কেওড়া বনের দেখা পাওয়া যায় , যা সৈকতটিকে অন্যান্য সৈকত থেকে একবারেই আলাদা করে রেখেছে। গুলিয়াখালী সমুদ্র সৈকত জুড়ে রয়েছে সবুজ ঘাসের গালিচা, যার মাঝে দিয়ে এঁকে বেঁকে বয়ে গেছে সরু নালা। সৈকতের এই জায়গাটি পর্যটকদের  কাছে ছবি তোলার অন্যতম প্রিয় স্থান। পাহাড়,জলরাশি, নালা ,সবুজ ঘাসের গালিচা ঘিরে সমুদ্র সৈকতটি এক অনন্য রূপ ধারন করেছে। এটি চন্দ্রনাথ পাহাড় থেকে মাত্র ৫ কিলমিটার দূরে অবস্থিত ,তাই পর্যটকরা চাইলে হোটেলে থাকার ব্যাবস্থা আছে। 

সীতাকুন্ড ইকো পার্ক

সীতাকুন্ড ইকো পার্কটি চট্টগ্রামের অন্যতম একটি বিখ্যাত জায়গা। পার্কটি চট্টগ্রাম শহর থেকে ৩৫ কিলমিটার দূরে অবস্থিত। সীতাকুণ্ড ইকো পার্কে রয়েছে নানান প্রজাতির দুর্লভ গাছ। পার্কটির ভিতর রয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির বন্য প্রানী, পাখির সমাহার। পার্কটিতে আছে সুপ্তধারা ও সহস্রধারা নামে দুটি মনোমুগ্ধকর ঝর্না। সীতাকুন্ড বোটানিক্যাল গার্ডেনে আছে একটি অর্কিড হাউজ দেশী ও বিদেশী মিলিয়ে ৫০ প্রজাতির অর্কিড সংরক্ষন করা আছে এই অর্কিড হাউজে।  এই পার্কটি দর্শনার্থীদের কাছে জনপ্রিয় একটি পিকনিক স্পটও। ইকোপার্কে খাবার পানি, উন্নত স্যানিটারি ব্যাবস্থা ,রেস্টহাউজসহ পিকনিকের সমস্ত সুব্যাবস্থা রয়েছে। 

মহামায়া লেক 

মহামায়া লেক চট্টগ্রাম জেলার মিরসরাই এ অবস্থিত। লেকটির আয়তন ১১ বর্গ কিলোমিটার। মহামায়া লেক পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত। বিশাল এলাকা জুড়ে লেকটি বিস্তৃত এটি বাংলাদেশের ২য় বৃহত্তম কৃত্রিম হ্রিদ। এখানে রয়েছে  পাহাড়ি গুহা , ঝর্ণা ও রাবার ড্যাম।  এই লেকে বোটে চড়ে পাহাড়ি ঝর্ণার কাছে যাওয়ার ব্যাবস্থা আছে। শুধু তাই নয়, মহামায়ে লেকের ৮ কিলোমিটাফ্র এর মাঝে পর্যটকদের জন্য কায়াকিং করার ব্যাবস্থাও আছে। সুরক্ষার জন্য প্রত্যেককে লাইফ জ্যাকেট প্রদান করা হয়। তাছাড়াও রয়েছে ইঞ্জিন চালিত বোটে করে লেক ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ। এডভেঞ্চার প্রেমীদের জন্য সপ্তাহের যেকোন দিন রাতে ক্যাম্পিং করার সুযোগ ও আছে। 

রেলওয়ে জাদুঘর

চট্টগ্রামের দর্শনীয় স্থানগুলোর মাঝে অন্যতম হলো বাংলাদেশ রেলওয়ে জাদুঘর। পার্বত্য চট্টগ্রামে অবস্থিত এই জাদুঘরটি বাঙ্গলাদেশের একমাত্র রেলওয়ে জাদুঘর। জাদুঘরটি ১৫ নভেম্বর , ২০০৩ সালে স্থাপিত হয়েছিল। দৃষ্টিনন্দন এই দোতলা বাংলোটি প্রায় ৪২০০ বর্গফুট এলাকা জুড়ে গঠিত।  জাদুঘরটির সংরক্ষনে রয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্ববর্তী সংস্থা আসাম বেঙ্গল রেলওয়ে ,ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ে, পাকিস্তান রেলওয়ে কতৃক ব্যবহৃত বিভিন্ন বস্তু। এছারাও জাদুঘরের সংরক্ষনে আছে, স্টেশন মাস্টারের পোশাক, ট্রান্সমিটার , অ্যানালগ টেলিফোন ,বিভিন্ন ধরনের আলো ও বাতি, মনোগ্রাম, পাকা ও ঘন্টাসহ আরো জিনিস। ২০০৩ সালের পূর্ব পর্যন্ত এটি রেলওয়ে বাংলো হিসেবে ব্যবহৃত হত। 

ফয়েজ লেক 

ফয়েজ লেক চট্টগ্রামের অন্যতম জনপ্রিয় একটি জায়গা। লেকটি পাহাড়তলি এলাকায় অবস্থিত এবং পূর্বে এটি পাহাড়তলি লেক হিসেবেই পরিচিত ছিল। ফয়েজ লেক ১৯২৪ সালে আসাম বেঙ্গল রেলওয়ে এর তত্ত্বাবধানে খনন করা হয়। লেকটি চট্টগ্রামের অন্যতম জনপ্রিয় পাহাড় বাটালি পাহারকে ঘেষে খনন করা হয়েছে ফুয়েজ লেককে ঘিরে গড়ে উঠেছে একটি থিম পার্ক যা শিশুদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। এখানে দর্শনার্থীদের নৌকাভ্রমন , ট্যাকিং এবং কন্সার্টের আয়োজন করা হয়।   পাশাপাশি এখানে আরও আছে বিরল প্রজাতির পাখি তাছাড়াও হরিণ পার্কে হরিণ দেখার ব্যবস্থা আছে। পর্যটকরা চাইলে কটেজে থাকার সুব্যবস্থাও আছে। লেকটির স্নিগ্ধ পরিবেশ ঘুরতে আসা মানুষদের প্রবলভাবে আকৃষ্ট করে।

বাওয়াছড়া লেক

বাওয়াছড়া লেক পার্বত্য চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে অবস্থিত। বারমাসি ছড়ার কাছে অবস্থানের কারনে একে বাওয়াছড়া লেক বলা হয়। লেকটিকে ঘিরে রয়েছে সবুজ পাহাড়ের সারি যা লেকের সৌন্দর্যকে কয়েকগুন বাড়িয়ে দিয়েছে।  পাহাড়ের উপর থেকে ঝর্ণার পানি বেয়ে লেকে পরার দৃশ্য পর্যটকদের এক নৈসর্গিক আবহে মোহিত করে রাখে। ক্যাম্পিং পছন্দ করে এমন অনেক পর্যটক ই পূর্নিমা রাতে বাওয়াছড়া লেককে ক্যাম্পিং এর জন্য বেছে নেয়। 

প্রজাপতি পার্ক 

চট্টগ্রামে পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত সংলগ্ন নেভাল একাডেমির ১৫ নং রোডে দেশের প্রথম প্রজাপতি পার্ক গড়ে তোলা হয়েছে। এই পার্কটি ২০১২ সালে আনুষ্ঠানিক ভাবে যাত্রা শুরু করে প্রজাপতি পার্ক প্রায় ৬ একর জায়গা জুড়ে গড়ে তোলা হয়েছে। এই পার্কে প্রায় ২০০ প্রজাতির প্রজাপতি রয়েছে এবং মোট প্রজাপতির সংখ্যা ১০০০। পার্কটিতে রয়েছে শিশুদের জন্য বেশ কিছু রাইদ, সেইসাথে বড়দের জন্য রয়েছে পার্কের জলাশয়ে নৌকা ভ্রমনের সুবিধা। পর্যটকদের আরো রয়েছে  রেস্টুরেণ্ট ও রেস্ট হাউজ। 

চট্টগ্রাম কমনওয়েলথ ওয়্যার সিমেট্রি

চট্টগ্রাম ওয়্যার সিমেট্রি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের খুব কাছেই গড়ে ঊঠেছে। এলাকাটি খুবই শান্ত মূল ফটক থেকে কিছুটা ভেতরে গেলেই চোখে পড়ে দুটি গির্জা ও মেটাল গেট। ডান পাশের গির্জায় আছে একটি মেমোরিয়াল বুক যাতে আছে ২য় বিশ্বযুদ্ধের সময় খুজে না পাওয়া  ভারতীয় বানিজ্য তরীর ৬৫০০ নাবিক ও লস্করের নাম। বাম পাশের গির্জায় আছে সিমেট্রি রেজিস্টার , যাতে এখানে সমাহিত সেনা সদস্যদের নাম ও পদবী লেখা আছে। এই সিমেট্রিতে আছে চল্লিশ হাজার বৃক্ষরাজি প্রতিদিন ই বহু পর্যটক এখানে ঘরতে আসে।

উপরে উল্লেখিত জায়গা গুলো ছাড়াও পার্বত্য চট্টগ্রামে আরও অনেক বিখ্যাত জায়গা আছে। জায়গাগুলোর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কারনে যুগ যুগ ধরে পর্যটকেরা ছুটে যান সেখানে। 

Show More

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button