জেনে নিন আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মানদণ্ড

গণতান্ত্রিক দেশের প্রথম শর্ত হল নির্বাচন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নির্বাচন প্রক্রিয়ায় ভিন্নতা রয়েছে। তবে, গণতান্ত্রিক মতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবার জন্য কিছু মানদণ্ড আছে, যা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। গণতন্ত্র ও মানবাধিকার রক্ষার স্বার্থে এসমস্ত মানদণ্ড নির্ধারণ করা হয়েছে, যা মেনে চললে সুষ্ঠু নির্বাচন হওয়া সম্ভব। 

জাতিসংঘের একটি নীতি অনুসারে, সরকার গঠিত হবে জনগণের ইচ্ছাকে প্রাধান্য দিয়ে। নির্ধারিত সময় পরপর ভোট গ্রহণের মাধ্যমে যে নির্বাচন করে সরকার নির্বাচিত হয়, তা জনগণের ইচ্ছারই প্রতিফলন। ১৯৯৬ সালের জুলাই মাসে জাতিসংঘ কমিটি নির্বাচন, ভোটাধিকার ও মানবাধিকার সংক্রান্ত একটি ঘোষণায় ২৫ টি বিষয়কে আন্তর্জাতিক নির্বাচনের মানদণ্ড হিসেবে নির্ধারণ করেছে। ঘোষনাটির শিরোনাম হচ্ছে – The Right to Participate in Public Affairs, Voting Rights and The Right to Equal Access to Public Service. 

২০১৫ সাল নাগাদ ইউএসএ এর দ্য কার্টার সেন্টার ও জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাই কমিশনারের আয়োজিত একটি কনফারেন্সের মূল বিষয় ছিল মানবাধিকার ও নির্বাচনের মানদণ্ড নিয়ে আলোচনা। 

দ্য কার্টার সেন্টারের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার, যার কাজ বিভিন্ন দেশের নির্বাচন পর্যবেক্ষণের দ্বারা গণতন্ত্রকে সুসংহত করা। 

আমেরিকার ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ইন্সটিটিউটের মতে, কোনো দেশের নির্বাচনী প্রক্রিয়াই শতভাগ সুষ্ঠু বা সঠিক নয়। তবুও কিছু সার্বজনীন বিষয় রয়েছে নির্বাচন অনুষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে, যেগুলো প্রায় সব দেশ মান্য করে এবং এগুলো আন্তর্জাতিক ভাবে স্বীকৃত। 

অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন 

অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের ক্ষেত্রে দুটি বিষয় লক্ষ্যণীয়। প্রথমটি হলো ভোটারদের অধিকার। প্রত্যেক ভোটার যেন সুষ্ঠুভাবে ভোট দিতে পারে। অপরটি হল, নির্বাচনে প্রার্থীদের অধিকার যেন ঠিকভাবে রক্ষিত হয়। আমেরিকার কার্টার সেন্টারের মতে, নির্বাচনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো প্রার্থী এবং রাজনৈতিক দল কারণ তারাই নাগরিকদের ইচ্ছের প্রতিনিধিত্ব করে। 

নির্বিঘ্ন প্রচারণা 

সুস্থ নির্বাচনী পরিবেশ দরকার, যেখানে প্রার্থী নির্বিঘ্নে ভোটারদের কাছে তাদের বার্তা পৌঁছে দিতে পারবে এবং ভোটারদের চাহিদা সম্বন্ধে অবগত হতে পারবে। নির্বাচনে কোন দলের জয়লাভের জন্য জনগণের সমর্থন অপরিহার্য। তাই প্রার্থীরা যাতে নির্বিঘ্নে প্রচারণা চালাতে পারে সেবিষয়ে প্যারিসে অনুষ্ঠিত ইন্টার পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের একটি সর্বসম্মত ঘোষণায় বলা হয়েছে। 

স্বাধীন পর্যবেক্ষক 

নির্বাচন নিরপেক্ষ এবং সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হচ্ছে কিনা তা স্বাধীন ও নির্দলীয় নাগরিক সংগঠনগুলোকে পর্যবেক্ষণ করতে দেওয়া উচিত। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতি অনুসারে, নির্বাচন যেহেতু জনগণের সাথে সম্পর্কিত বিষয় তাই সেখানে নাগরিকদের অংশ নিয়ে বিভিন্ন বিষয় পর্যবেক্ষণের অধিকার রয়েছে। যেমন: ভোট গণনা ঠিকভাবে হচ্ছে কিনা, ভোট গ্রহণ ঠিকভাবে হচ্ছে কিনা ইত্যাদি। শুধু আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতিই নয়, নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষকদের বিষয়টি আরও বেশ কিছু আন্তর্জাতিক সনদে উল্লেখিত রয়েছে। 

গণমাধ্যমের অধিকার 

ইন্টার পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের মতে, বিভিন্ন গণমাধ্যম, যা সরকার নিয়ন্ত্রিত, তাতে বিরোধী দলও যাতে সমানভাবে মতপ্রকাশ করতে পারে সেবিষয় নিশ্চিত করা জরুরি। এছাড়া, বেসরকারি গণমাধ্যমগুলোকেও নির্বাচন সংক্রান্ত খবর প্রকাশ করার জন্য উসাহিত করতে হবে। 

স্বাধীন সংস্থা 

জাতিসংঘের নীতি অনুসারে, নির্বাচন প্রক্রিয়া তত্ত্বাবধানের জন্য স্বাধীন নির্বাচনী সংস্থা থাকা প্রয়োজনীয়, যাদের কাজ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন পরিচালনা করা। ভোটদানের ক্ষেত্রে কোন বাধা-বিপত্তি যাতে না আসে সেবিষয় লক্ষ্য করার দায়িত্ব এই স্বাধীন সংস্থার। 

ভোটগণনা

জাতিসংঘের একটি কমিটির ঘোষণা অনুযায়ী, ভোটগণনা করতে হবে প্রার্থীদের এজেন্ট বা প্রতিনিধিদের সামনে। অর্থা, গোপনে ভোট গণনা করা যাবে না। 

অন্যান্য বিষয় 

উপরোক্ত বিষয়গুলো ছাড়াও, আরও কিছু দিক রয়েছে যা নির্বাচনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। যেমন: ভোটারের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা। ভোটার যাতে স্বাধীনভাবে তার ভোট তার ইচ্ছেমত প্রার্থীকে দিতে পারে তা নিশ্চিত করতে হবে। ভোটারদের ওপর কোনো প্রকার চাপ, ভয়-ভীতি প্রয়োগ করা যাবে না বা তাদের অর্থের প্রলোভনও দেখানো যাবে না। গোপন ব্যালটে ভোট নিতে হবে এবং ব্যালট বাক্সের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে হবে৷ যে সমস্ত প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে, তাদের পূর্ণাঙ্গ তথ্যাদি ভোটারদের জানাতে হবে, যাতে তারা বুঝতে পারে যে আসলে কাকে ভোট দিচ্ছে। 

Show More

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button